আবূ তালিব মুসলিম ছিলেন না – ০২

254

আল্লামাহ গোলাম মোস্তাফা যহীর আমানপুরী

অনুবাদ : উযাইর রহমান ও রিয়াজ হুসাইন

এখন অতি সংক্ষেপে আবূ তালিবের মুসলিম না হওয়ার দলীলসমূহ উপস্থাপন করছি।

দলীল নম্বর ০৪ : আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাযি.) বর্ণনা করেন: عَنْ عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ نَفَعْتَ أَبَا طَالِبٍ بِشَيْءٍ فَإِنَّهُ كَانَ يَحُوطُكَ وَيَغْضَبُ لَكَ قَالَ نَعَمْ هُوَ فِي ضَحْضَاحٍ مِنْ نَارٍ لَوْلَا أَنَا لَكَانَ فِي الدَّرَكِ الْأَسْفَلِ مِنْ النَّارِ – “হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আপনি কি আবূ তালিবের কোনো উপকার করতে পারবেন? তিনি তো সবসময় আপনার হিফাযত করতেন এবং আপনার জন্য অন্যের উপর রাগ করতেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি এখন জাহান্নামের হালকা স্তরে আছেন। যদি আমি না থাকতাম, তাহলে তিনি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকতেন।” [সহীহ বুখারী : ৩৮৮৩; সহীহ মুসলিম : ১/১১৫, হা/২০৯; হা.এ. হা/৩৯৮]

হাফেয সুহাইলী (রাহি.) [৫০৮-৫৮১ হি.] বলেন:وَظَاهِرُ الْحَدِيثِ يَقْتَضِي أَنّ عَبْدَ الْمُطّلِبِ مَاتَ عَلَى الشّرْكِ – “হাদীসের বাহ্যিক অর্থ আবদুল মুত্তালিব মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণের কথাই প্রমাণ করে।” [আর রাওদাল উনুফ : ৪/১৯]

হাফেয ইবনু হাজার (রাহি.) উক্ত হাদীসের নিচে বলেন: فَهَذَا شَأْنُ مَنْ مَاتَ عَلَى الْكُفْرِ فَلَوْ كَانَ مَاتَ عَلَى التَّوْحِيْدِ لَنَجَا مِنَ النَّارِ أَصْلًا وَالْأَحَادِيْثُ الصَّحِيْحَةُ وَالْأَخْبَارُ الْمُتَكَاثِرَةُ طَافِحَةٌ بِذَلِكَ – “এ পরিণতি তো ঐ ব্যক্তির হবে, যে কাফের অবস্থায় মারা গিয়েছে। সে যদি তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণ করত তাহলে অবশ্যই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেত। কিন্তু অনেক সহীহ হাদীস এবং অসংখ্যা আসার (আবূ তালিবের কুফরের) ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে।” [আল ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ : ৭/২৪১]

দলীল নম্বর ০৫ : আবূ সাঈদ খুদরী (রাযি.) বর্ণনা করেন: عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَذُكِرَ عِنْدَهُ عَمُّهُ فَقَالَ لَعَلَّهُ تَنْفَعُهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُجْعَلُ فِي ضَحْضَاحٍ مِنْ النَّارِ يَبْلُغُ كَعْبَيْهِ يَغْلِي مِنْهُ دِمَاغُهُ – “তিনি নাবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন। তাঁর সামনে চাচা আবূ তালিবের আলোচনা করা হলে তিনি (সা.) বললেন, আশা করি কিয়ামাতের দিনে আমার সুপারিশ তার উপকারে আসবে; আর তাকে আগুনের হালকা স্তরে রাখা হবে। যেখানে আগুন তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌঁছবে, আর তাতেই তার মগজ ফুটতে থাকবে।” [সহীহ বুখারী : ৩৮৮৫; সহীহ মুসলিম : ১/১১৫, হা/২১০; হা.এ. হা/৪০১]

দলীল নম্বর ০৬ : ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত: عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : أَهْوَنُ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا أَبُو طَالِبٍ وَهُوَ مُنْتَعِلٌ بِنَعْلَيْنِ يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ – “রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি হবে আবূ তালেবের। আর তা হলো সে আগুনের দুটি জুতা পরিধান করবে যাতে তার মগজ গলে যাবে।” [সহীহ মুসলিম : ১/১১৫, হা/২১২; হা.এ. হা/৪০৩]

দলীল নম্বর ০৭ : আলী (রাযি.) বলেন: لما توفي أبي أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلت : إن عمك قد توفي قال : «اذهب فواره قلت : إنه مات مشركا قال : اذهب فواره ولا تحدثن شيئا حتى تأتيني ففعلت ثم أتيته فأمرني أن أغتسل – “আমার পিতা মারা গেলে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর নিকট এসে বললাম : আপনার চাচা তো মৃত্যুবরণ করলেন? তিনি (সা.) বললেন : যাও তাকে দাফন করো। আমি বললাম তিনি তো মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন? তিনি (সা.) বললেন : যাও! তাকে দাফন করো। আর আমার নিকট ফিরে আসা পর্যন্ত কোনো অন্য কোনোকিছু করো না। আমি তাই করলাম অতঃপর তার নিকট আসলে আমাকে গোসল করার নির্দেশ দিলেন। [মুসনাদুত তায়ালিসী : দারুল মারেফাহ, হা/১২০; দারুল হিজর, হা/১২২; সানাদ হাসান মুত্তাসিল]

অপর একটি বর্ণনায় আছে, আলী (রাযি.) বলেন: عَنْ عَلِيٍّ قَالَ: قُلْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ عَمَّكَ الشَّيْخَ الضَّالَّ مَاتَ فَمَنْ يُوَارِيهِ قَالَ: اذْهَبْ فَوَارِ أَبَاكَ – “আপনার পথভ্রষ্ট বৃদ্ধ চাচা মারা গেছেন, তাকে দাফন করবে কে? তিনি বললেন, যাও এবং তোমার পিতাকে দাফন করো।” [মুসনাদ ইমাম আহমাদ : ১/৯৭, সুনান আবূ দাউদ : ৩২১৪, সুনান আন-নাসাঈ : ১৯০, ২০০৮; সানাদ হাসান]

এই হাদীস ইমাম ইবনু খুযাইমাহ (রাহি.) (অনুরূপ আল ইসাবা লি ইবনু হাজার : ৪/১১৪), আর ইমাম ইবনু জারূদ (রাহি.) : ৫৫০, সহীহ বলেছেন। এ হাদীস অকাট্য দলীল যে, আবূ তালিব মুসলিম ছিলেন না। তার উপর নাবী (সা.) আর আলী (রাযি.) সালাতুল জানাযা পড়েননি।

দলীল নম্বর ০৮ : উসামা বিন যায়দ (রাযি.) সুস্পষ্টভাবে বলেন: وَكَانَ عَقِيلٌ وَرِثَ أَبَا طَالِبٍ هُوَ وَطَالِبٌ وَلَمْ يَرِثْهُ جَعْفَرٌ وَلَا عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا شَيْئًا لِأَنَّهُمَا كَانَا مُسْلِمَيْنِ وَكَانَ عَقِيلٌ وَطَالِبٌ كَافِرَيْنِ – “আক্বীল ও তালিব উভয়ই আবূ তালিবের উত্তরাধিকারী হয়েছিল কিন্তু জা‘ফর ও আলী (রাযি.) উত্তরাধিকারী হতে পারেননি। কেননা তারা উভয়ে ছিলেন মুসলিম। আর আক্বীল ও তালিব ছিল কাফের।” [সহীহ বুখারী : ১৫৮৮; সহীহ মুসলিম : ২/৩৩, হা/১৩৫১; হা.এ. হা/৩১৮৫]

উক্ত রিওয়ায়াতও স্পষ্ট দলীল যে, আবূ তালিব কুফরের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিল। তাই তো আক্বীল ও তালিব-এর বিপরীতে জাফার ও আলী, আবূ তালিবের উত্তারাধিকার হননি। কেনন নাবী (সা.)-এর মহান বাণী: لَا يَرِثُ الْمُسْلِمُ الْكَافِرَ وَلَا الْكَافِرُ الْمُسْلِمَ – “মুসলিম কোনো কাফেরের এবং কাফের কোনো মুসলিমের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না।” [সহীহ বুখারী : ৬৭৬৪; সহীহ মুসলিম : ২/৩৩, হা/১৬১৪; হা.এ. হা/৪০৩২]

ইমাম ইবনু আসাকির (রাহি.) [৪৯৯-৫৭১ হি.] বর্ণনা করেন: وقيل أنه أسلم ولا يصح اسلامه – “বলা হয় যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার ইসলাম গ্রহণ অপ্রমাণিত।” [তারিখ দিমাশক : ৬৬/৩০৭]

আবূ তালিব ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করায়, নাবী (সা.) অনেক ব্যথিত হয়েছিলেন। অবশ্যই আবূ তালিবের পুরো জীবন ইসলামের বন্ধু ছিলেন। ইসলাম ও ইসলামের রাসূলের জন্য সর্বদ নম্র ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা যে, সে ইসলামের ধন দ্বারা ধনী হতে পারেনি। তাই আমরা আমাদের অন্তর ব্যথিত হলেও তার জন্য দুআ করতে পারব না।

হাফিয ইবনু কাসীর (রাহি.) [৭০০-৭৭৪ হি.] আবূ তালিবের কুফরের অবস্থায় মৃত্যুবরণ প্রসঙ্গ উল্লেখের পর লিখেছেন: ولو لا ما نهانا الله عنه من الاستغفار للمشركين لاستغفرنا لابي طالب وترحمنا عليه – “মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপারে মহান আল্লাহ যদি আমাদের নিষেধ না করতেন, তাহলে অবশ্যই আমি আবূ তালিবের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম এবং তার প্রতি অনুগ্রহের দুআ করতাম।” [সীরাতুর রাসূল লি ইবনু কাসীর : ২/১৩২]


প্রথম পর্ব পড়ার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন: