আবূ তালিব মুসলিম ছিলেন না – ০১

212

আল্লামাহ গোলাম মোস্তাফা যহীর আমানপুরী

অনুবাদ : উযাইর রহমান ও রিয়াজ হুসাইন

এখন অতি সংক্ষেপে আবূ তালিবের মুসলিম না হওয়ার দলীলসমূহ উপস্থাপন করছি।

দলীল নম্বর ০১ : মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ – “নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন।” [আল কাসাস, ২৮ : ৫৬]

ঐক্যমত অনুযায়ী এ আয়াত আবূ তালিব সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। যেমন, হাফিয নাবাবী (রাহি.) [৬৩১-৬৭৬ হি.] বলেন:

فَقَدْ أَجْمَعَ الْمُفَسِّرُونَ عَلَى أَنَّهَا نَزَلَتْ فِي أَبِي طَالِب. وَكَذَا نَقَلَ إِجْمَاعهمْ عَلَى هَذَا الزَّجَّاج وَغَيْره. وَهِيَ عَامَّة فَإِنَّهُ لَا يَهْدِي وَلَا يُضِلّ إِلَّا اللَّه تَعَالَى – “সকল মুফাসসিরগণ একমত যে, আয়াতটি আবূ তালিবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ইজমার এ বিষয়টি যাজ্জাজ (মাআনিউল কুরআন ওয়াল এরাব, ৪/১৪৯) এবং অন্যান্যরা লিপিবদ্ধ করেছেন। আবার আয়াতটি ব্যাপক অর্থবোধক যে, একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ হেদায়াত দিতে পারে না এবং পথভ্রষ্টও করতে পারে না।” [শারহ সহীহ মুসলিম লিন নাবাবী, ১/৪১]

হাফিয ইবনু হাজার (রাহি.) [৭৭৩-৮৫২ হি.] বলেন: لَمْ تَخْتَلِفِ النَّقَلَةُ فِي أَنَّهَا نَزَلَتْ فِي أَبِي طَالِبٍ – “এ কথায় কোনো মতভেদ নেই যে, আয়াতটি আবূ তালিবের ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে।” [ফাতহুল বারী, ৮/৫০৬]

যাদুল মাসীর ফী ইলমুত তাফসীর লি ইবনুল জাওযী, ৩/৩৮৮; আত তাফসীরুল কাবীর লির রাযী, ২৫/৫; আল জামে লি আহকামিল কুরআন লিল কুরতুবি, ১৬/২৯৭; মাদারিকুত তানযীল ওয়া হাক্বাইকুত তাওয়ীল লিন নাসাফী, ২/৬৪৯; গারাইবুল কুরআন ওয়া রাগাইবুল ফুরক্বান লিন নাইসাবুরী, ৫/৩৫২; আল বাহরুল মাদীদ ফী তাফসীরিল কুরআনিল মাজীদ লি আবিল আব্বাস আল ফাসী, ৪/২৬২; আত তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর লি ইবনে আশুর, ২০/১৪৭ ইত্যাদি গ্রন্থে আবূ তালিবের মুসলিম না হওয়ার ব্যাপারে ইজমা লিপিবদ্ধ করেছেন।

দলীল নম্বর ০২ : মুসায়্যাব বিন হুযন বর্ণনা করেন:

أَنَّ أَبَا طَالِبٍ لَمَّا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ دَخَلَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَعِنْدَهُ أَبُوْ جَهْلٍ فَقَالَ أَيْ عَمِّ قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ كَلِمَةً أُحَاجُّ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللهِ فَقَالَ أَبُوْ جَهْلٍ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ أَبِيْ أُمَيَّةَ يَا أَبَا طَالِبٍ تَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَمْ يَزَالَا يُكَلِّمَانِهِ حَتَّى قَالَ آخِرَ شَيْءٍ كَلَّمَهُمْ بِهِ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لَاسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أُنْهَ عَنْهُ فَنَزَلَتْ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْآ أُولِيْ قُرْبٰى مِنْم بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيْمِ (التوبة : 113) وَنَزَلَتْ إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ (القصص : 56)

আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তার নিকট আসলেন। সেখানে তিনি আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ বিন আবী উমাইয়া ইবনুল মুগীরাকে পেলেন। তিনি (সা.) বললেন: হে চাচা! আপনি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলুন! এটি এমন একটি কালিমা, যার বিনিময়ে আমি মহান আল্লাহর নিকট আপনার জন্য সাক্ষ্য দিব। তখন আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবী উমাইয়াহ বলে উঠল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাত (দীন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে?

আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বারংবার তাঁর কথাটি পেশ করতে থাকলেন। আবূ তালিব শেষে যে কথাটি বললেন তা হলো, তিনি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরই অটল থাকবেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর শপথ! যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হয়, আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকব। তখন মহান আল্লাহ এ আয়াতটি নাযিল করলেন, مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ – “নাবী এবং ঈমানদারদের পক্ষে মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা শোভা পায় না, যদিও তারা (মুশরিকরা) নিকটাত্মীয় হয়। কেননা তারা যে জাহান্নামী হবে এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।” [আত তাওবাহ, ৯ : ১১৩]

আবূ তালিবের ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা.) কে আয়াত নাযিল করে বললেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ – “নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাসো তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনিই ভাল জানেন।” [আল কাসাস, ২৮ : ৫৬] [সহীহ বুখারী : ৩৮৮৪; সহীহ মুসলিম : ১/৪০, হা/২৪; হা.এ. হা/৩৯]

উক্ত হাদীস এ কথার দলীল যে, আবূ তালিব কাফির ছিল। সে আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপর মারা গেছে। মৃত্যুর সময় তিনি কালিমা পড়তে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে। তার ভাগ্যে হেদায়াত জুটেনি। আল্লাহ তাআলা নাবীকে তার পক্ষে দুআ করতে নিষেধ করেছেন।

অপর বর্ণনার শব্দ হচ্ছে : حَتَّى قَالَ أَبُو طَالِبٍ آخِرَ مَا كَلَّمَهُمْ هُوَ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ وَأَبَى أَنْ يَقُولَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ‏ – “অবশেষে আবূ তালিব তাদের সামনে শেষ কথাটি যা বলল, তা এই যে, সে আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর অবিচল রয়েছে, সে ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু’ বলতে অস্বীকার করল।” [সহীহ বুখারী : ১৩৬০]

দলীল নম্বর ০৩ : আবূ হুরায়রাহ (রাযি.) বর্ণনা করেন: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِعَمِّهِ‏ قُلْ: لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ لَكَ بِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ‏ قَالَ: لَوْلاَ أَنْ تُعَيِّرَنِي قُرَيْشٌ يَقُولُونَ: إِنَّمَا حَمَلَهُ عَلَى ذَلِكَ الْجَزَعُ لأَقْرَرْتُ بِهَا عَيْنَكَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ: ‏{‏إِنَّكَ لاَ تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ‏}‏ – “রসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচাকে বললেন, আপনি লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ বলুন, কিয়ামাত দিবসে আপনার পক্ষে আমি এর সাক্ষ্য দিব। উত্তরে তিনি বললেন, যদি কুরাইশরা আমাকে ভর্ৎসনা না করত যে, মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে আমি এ কথা বলেছি; তাহলে আমি তা পাঠ করে তোমার চোখ জুড়াতাম। অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ – “তুমি যাকে চাইবে হিদায়াত করতে পারবে না, কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন হিদায়াত দান করেন।” [আল কাসাস, ২৮ : ৫৬] [সহীহ মুসলিম : ১/৪০, হা/২৫; হা.এ. হা/৪১]

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।


দ্বিতীয় পর্ব পড়ার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন: